কারাবাস আর উত্থান-পতনের গল্প শোনালেন আনোয়ার ইব্রাহিম

b2d5287a796a0fb3146c8730e06d2ad4-5b026ca3b4602

সরকারের উচ্চপর্যায়ের পদ থেকে নির্বাসিত বিরোধী নেতায় পরিণত হওয়া, আদালতের মুখোমুখি হওয়া, কারাবরণ, বিশ্বাসঘাতকতা- সবকিছুরই স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে মালয়েশিয়ার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে। সমকামিতার অভিযোগে দীর্ঘদিন কারাবরণের পর সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন তিনি। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা ওই অভিযোগ যে মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, তা এরইমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মুক্তি পাওয়ার কয়েকদিন পরই কুয়ালালামপুরে নিজ বাড়িতে বসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য অবজারভারকে সাক্ষাৎকার দেন আনোয়ার ইব্রাহিম। কারাগারে যাওয়ার পর তাকে ও পরিবারকে কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের শত্রু মাহাথির কীভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, জোট গঠনের প্রস্তাব দিলেন, তা জানান তিনি। অবজারভারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭০ বছর বয়সী এই সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রীকে সাক্ষাৎকারের সময় দুর্ভাবনাহীন ও শান্ত দেখাচ্ছিলো।

আনোয়ার ইব্রাহিম
গত ৯ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা বারিসান ন্যাসিওনাল সরকারকে হারিয়ে জয়লাভ করে চার দলের নতুন জোট। মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতাসীন জোটের নেতা আর আনোয়ার জোটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জেতা দল পিকেআর’র নেতা। এই দুজন প্রথমে বন্ধু, তারপর শত্রু ও পরে জোটের মিত্রে পরিণত হয়েছেন। তাদের এমন পরিবর্তনশীল সম্পর্ক গত তিন দশক ধরে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। বিদ্যমান জোটের ভবিষ্যৎও তাদের দুজনের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার নির্বাচনে জয় পাওয়া এ বিরোধী জোটটির নেতৃত্বে ছিলেন ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ইউএমএনও দলের প্রধান। এটি ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাসিওনালেরই অংশ। আনোয়ার ইব্রাহিমকে তখন তার উত্তরাধিকারী বলে বিবেচনা করা হতো। আনোয়ার ছিলেন সংস্কারবাদী। ইসলামের একটি সমন্বয়বাদী ও গণতান্ত্রিক ধারার পক্ষে অবস্থান ছিল তার। ১৯৯৮ সালে স্বজনপ্রীতিমূলক আচরণের জন্য আনোয়ার মাহাথিরকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখানোর পর পরিস্থিতির বদল ঘটলো। আনোয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন, মাহাথির তার বন্ধুদের রাষ্ট্রীয় ঠিকাদারির কাজগুলো দিয়ে দিতেন। এরপর আনোয়ারকে বরখাস্ত করেন মাহাথির। সমকামের অভিযোগে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। কয়েকজন পুরুষ সাক্ষী জবানবন্দিতে অভিযোগ করেন, তাদের জোরপূর্বক যৌন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে বাধ করতেন আনোয়ার (অবশ্য পরে ওই সাক্ষীরা স্বীকার করেছিলেন, তাদের ওই সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিলো)। সমকামিতার অভিযোগে সে সময় আনোয়ারকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। ছয় বছর ধরে নির্জন কারাবাসে রাখা হয় আনোয়ারকে। পরিবারের সদস্যদেরও তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো না। ২০০৪ সালে মুক্তি পান আনোয়ার।

এরপর আনোয়ার ইব্রাহিম বিরোধীদের সঙ্গে যোগ দেন। গড়ে তুললেন নিজের দল পিকেআর। ২০১৩ সালের নির্বাচনে নাজিব রাজাকের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন তিনি। ওই নির্বাচনে আনোয়ার ইব্রাহিম হেরে গেলেও পপুলার ভোট অর্জন করেছিলেন তিনি। আর তা নাজিবকে উদ্বেগে ফেলে দেয়। নাজিবের ব্যাপারে অবজারভারকে আনোয়ার বলেন, ‘আমি কখনও তাকে সমর্থন করিনি, তার বিরুদ্ধে আমার কঠোর অবস্থান ছিল এবং একে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছিলেন তিনি। সে কারণে তিনি (নাজিব) আমাকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন।’

বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার করে আবারও আনোয়ারকে সমকামের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করেন নাজিব। ২০১৫ সালে আবারও আনোয়ারকে কারান্তরীণ হতে হয়। এ ব্যাপারে আনোয়ার বলেন, ‘২০১৩ সালের নির্বাচন যদি অবাধ ও স্বচ্ছ হতো তবে আমরা জিতে যেতাম এবং আমাকে জেলে থাকতে হতো না—এ কথা জেনেও জেলে পড়ে থাকাটা সহজ ব্যাপার ছিল না।’

এ ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ কিনা সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি অনেক বছর ধরে জেল খাটার পর আপনার কাছে সে তিক্ততাকে বেশি কিছু মনে হবে না। আমি মহামানবিকতা বোধসম্পন্ন ও ক্ষমাশীল মানুষ হওয়ার নাটক করছি না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমি তিক্ততা বোধ করিনি।’

মাহাথির মোহাম্মদ
মাহাথিরের সঙ্গে সম্পর্কের উত্থান পতন

মাহাথির যখন আনোয়ারকে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরখাস্ত করেছিলেন, তখন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি বাসভবন ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। ছোট ছোট সন্তানদের কথা বলে বাড়ি ছাড়ার জন্য আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছিলেন আনোয়ার। মাহাথির তখন আনোয়ারের বাড়ির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

১৯৯৯ সালে সমকামিতার দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মাহাথিরকে ‘ভীরুচিত্তের মানুষ’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন আনোয়ার। অভিযোগ করেছিলেন, মাহাথির নিজের লোকেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না এবং তার ক্ষমতার লোভ অনেক বেশি।

এর বদলা নিয়েছিলেন মাহাথির। আনোয়ার যখন জেলে ছিলেন তখন পরিবারের সদস্যদের তার সঙ্গে দেখা করতে দেননি। ২০০৪ সালে আনোয়ার মুক্তি পাওয়ার পরও মাহাথির তাকে নিয়ে তিরস্কার করে যেতে লাগলেন। ২০০৫ সালে এক বক্তৃতায় মাহাথির বলেছিলেন, ‘ভেবে দেখুন তো, একজন সমকামী যদি প্রধানমন্ত্রী হন কেমন হবে। কেউই নিরাপদ থাকবে না।’ মানহানিকর বক্তব্যের জন্য মাহাথিরের বিরুদ্ধে মামলাও করতে চেয়েছিলেন আনোয়ার। কিন্তু ব্যর্থ হন তিনি।

আনোয়ার বলেন, এ বছরের জানুয়ারিতে মাহাথির যখন জোট গঠনের জন্য তার সঙ্গে জেলে দেখা করতে চাইলেন তখন তা নিয়ে সংশয়ী ছিলেন তিনি। আনোয়ার বলেন, “আমার জন্য এটা বেশ কঠিন ছিল এবং শুরুতে আমি মাহাথিরকে বলেছি: ‘কেন আমি আপনার সঙ্গে জোট বেঁধে আর কোনও কিছু করতে যাবো। আমি আপনাকে ক্ষমা করে দেব, কিন্তু বিদায় হোন: ব্যস এটুকুই’।”

‘কিন্তু আমরা দুজন মিলে যখন আলাপ করলাম, তাকে বোঝার চেষ্টা করলাম, বুঝতে পারলাম তার মতো আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মপ্রত্যয়ী লোক আমার সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে আসার মানে হলো তিনি সত্যি সত্যি মরিয়া হয়ে উঠেছেন, নয়তো সত্যিই খানিকটা কোমল হয়েছেন। অল্প কথায় বলতে গেলে সেটাই হয়েছে’—বলে যান আনোয়ার।

নাজিব রাজাক
মাহাথিরের সঙ্গে জোট নিয়ে আনোয়ারের সন্তানদের অবস্থান

বাবা কারাগারে থাকা অবস্থাতেই শৈশবের বেশিরভাগ সময় পার করতে হয়েছে আনোয়ারের সন্তানদের। তার মেয়ে নুরুল ইজ্জাহ এখন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। মাহাথিরের সঙ্গে জোট করার প্রস্তাবটিকে আনোয়ারের সন্তানরা মেনে নিতে পারছিলেন না। এ ব্যাপারে আনোয়ার অবজারভারকে বলেন, “আমার সন্তানরা রাজি হলো না, ঘরের কোনায় বসে বসে কাঁদতে শুরু করলো তারা। তারা বুঝতে পারছিল না, যে ব্যক্তি তাদের জীবনকে নরক বানিয়েছে তার সঙ্গে কেন আমি দেখা করব। তারা আমাকে সম্মতি দিলো না। বললো, মাহাথিরের সঙ্গে আমার চুক্তি করা উচিত নয়। ওরা আমাকে বললো, ‘তার কারণে তুমি ভুগেছো, আমরা সবাই ভুগেছি’।”

“কিন্তু আমি তাদের বললাম, ‘যখন তোমাদের তথাকথিত শত্রু এসে বলবে ‘চলো আমরা অতীতের কথা ভুলে যাই এবং বন্ধু হই?’ এক্ষেত্রে না বলাটা খুব কঠিন।”

অবশ্য, আনোয়ারের পরিবারকে যে অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছিল তার জন্য মাহাথির এখনও ক্ষমা চাননি। তিনি বলেছেন, আনোয়ারকে বরখাস্ত করা তার উচিত হয়নি। এ ব্যাপারে আনোয়ার বলেন, ‘মাহাথির যতটুকু করেছে তা আমার জন্য যথেষ্ট।’

কারাগারে বসেও আনোয়ার টের পেলেন মালয়েশিয়ার নির্বাচনি জোয়ার সরকারবিরোধী জোটের দিকে। কারারক্ষী এবং চিকিৎসকরাও তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরু করেন। আর তার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা গেল নির্বাচনের দিন। বিরোধী জোটের পক্ষে রায় দিলো মালয়েশীয় জনগণ।

আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আনোয়ার। মাহাথিরের মন্ত্রিসভায় যুক্ত হবেন না তিনি। যেকোনোভাবেই হোক তিনি নিজেকে সরকারের কাছ থেকে দূরে রাখতে চাইছেন। আনোয়ারের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ বর্তমানে উপ-প্রধানমন্ত্রীর দাত্বি পালন করছেন। তিনি মাহাথিরের ওপর নজর রাখছেন। অবশ্য, দুই বছর পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের বাসনা ছেড়ে দেননি আনোয়ার। নিজের সংস্কারবাদী বিশ্বাসের জন্য তাকে আর তার পরিবারকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এখন সেগুলোকে মানুষের চর্চার মধ্যে নিয়ে আসতে চান আনোয়ার।

আনোয়ারের বিশ্বাস, দুই বছরের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন মাহাথির। আনোয়ার জানান, তারা পেছনের পথগুলো ফেলে এসেছেন। এখন তারা ২০ বছরের বিরোধ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে মজা করতে পারেন।

অবজারভারের প্রতিবেদনে বলা হয়, আনোয়ার ও মাহাথিরের যৌথ সংকল্প হলো নাজিবকে দুর্নীতির দায়ে বিচারের মুখোমুখি করা। নাজিবের বিরুদ্ধে ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত আছে। অভিযোগ রয়েছে, নাজিব সরকারি তহবিল থেকে ৪০০ কোটি ডলার সরিয়ে নিয়েছিলেন। ১০ মে মাহাথিরের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ক্ষমতা নিয়েই নাজিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেয়। নাজিবের দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। শুরু হয় তল্লাশি অভিযান। নাজিব রাজাকের মালিকানাধীন বিভিন্ন স্থাপনা থেকে গহনা ও বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল বস্তু জব্দ করা হয়।

একদিকে আনোয়ার সদ্য জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, অন্যদিকে গুরুতর আইনি জটিলতার মুখোমুখি নাজিব রাজাক। অবজারভারের পক্ষ থেকে আনোয়ারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য তার কোনও পরামর্শ আছে কিনা? জবাবে মুচকি হেসে আনোয়ার বলেন, ‘ভালো আইনজীবী ঠিক করুন’ এবং ‘অনুতাপ প্রকাশ করুন’।