প্রতিমন্ত্রীর মেয়ে হওয়াই কাল হলো মৌসুমীর

সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের মেয়ে হওয়াই যেন কাল হলো নাটোর সদর উপজেলার চন্দ্রকোলা এলাকার শেখ মুজিব কলেজের অধ্যক্ষ মৌসুমী পারভীনের। যুবলীগ কর্মী সাব্বিরের স্ট্যাম্পের আঘাতে বাম পায়ের হাঁটুর নিচে ভেঙে তিনি এখন বিছানায় কাতরাচ্ছেন। পাশে ছয় বছরের ছেলে সামির চোখেও যেন মায়ের কষ্টের ছাপ। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আহত মায়ের দিকে।
শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পৌর যুবলীগ সদস্য, শহরের কানাইখালী এলাকার সোনা মিয়ার ছেলে রেদোয়ান সাব্বিরের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী আক্রমণ করে সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের বাড়িতে। তারা বাড়ির গার্ড ছাড়াও প্রতিমন্ত্রীর দুই মেয়ে ও জামাতাদের ওপর আক্রমণ চালায়। কোনও রকমে নিজ ঘরে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে আক্রমণ থেকে রক্ষা পান আহাদ আলী সরকারের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম।
আহত মৌসুমী পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সাব্বির তাকে বিনা দোষে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়েছে। কেন মারা হচ্ছে জানতে চাইলে আক্রমণ আরও বেড়ে যায়। সন্ত্রাসীদের আক্রমণ থেকে বাদ পড়েননি তার স্বামী আশরাফুল ইসলাম, দুলাভাই মাজাহারুল ইসলাম ও বড় বোন ফারজানা সুলতানা মুক্তা। সন্ত্রাসীরা তার মাকেও অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করেছে। এক পর্যায়ে মা নিজ ঘরে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে নিজেকে রক্ষা করেছেন।
আহাদ আলীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সাব্বির তার সঙ্গীদের নিয়ে বাড়িতে ঢুকে জোর করে আহাদ আলীর রুমে প্রবেশ করে। এ সময় সে আহাদের চেয়ারে বসে বলে ‘আমি দ্বিতীয় আহাদ’। এ সময় মৌসুমী জানতে চায় আপনারা আমাদের বাড়িতে এসেছেন কেন? বলা মাত্র সে হাতের স্ট্যাম্প দিয়ে মৌসুমীকে পেটাতে থাকে। এ সময় তার স্বামী আশরাফুল বাধা দিতে গেলে তাকেও মারপিট করে। তারা আশরাফুলের পকেট থেকে এক হাজার টাকা ও হাইপারটেনশনের ওষুধ কেড়ে নেয়। এরপর তারা বড় মেয়ে ফারজানা সুলতানা মুক্তাকেও চড় মারে। বড় মেয়ের স্বামী মাজাহারুল এগিয়ে এলে তার ওপরও আক্রমণ চালায়। একটি টি-টেবিল দিয়ে তার মুখ, চোখ, ঘাড়ে আঘাত করতে থাকে। এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা মৌসুমীর গলার স্বর্ণের চেইন, হাতের দুইটি বালা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এরপর তারা ফারজানার গলার চেইন ও হাতের চুড়ি ছিনিয়ে নেয়। তিনি (মনোয়ারা) নিজের ঘরে ভেতর থেকে তালা দিয়ে আহাদ আলীকে ফোন করে তাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা নিতে বলেন। এ সময় তারা দরজায় লাথি মেরে ভাঙার চেষ্টা করে। ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।
তিনি জানান, আহাদকে ফোন করার প্রায় ৩০ মিনিট পর পুলিশ আসে। ততক্ষণে সন্ত্রাসীরা বাড়ি থেকে চলে যায়। যাওয়ার আগে সাব্বির তার মেয়েদের মারতে মারতে বলতে থাকে, ’এই তোর বাপ নাকি আবার মন্ত্রী হচ্ছে?’
আহাদ আলী সরকার দাবি করেন, বেশ কিছুদিন থেকে নাটোরের মানুষদের মধ্যে একটা গুজব ছড়িয়েছে যে, আহাদ আলী আবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পাচ্ছেন।কিন্তু তিনি নিজে এর কিছুই জানেন না। এই খবরটি জানার পরই হয়ত, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সন্ত্রাসীদের দিয়ে তাকে হত্যা কিংবা আহত করতে চেয়েছিল। তাকে না পেয়েই তার বাড়ির সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাকে কখন কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেবেন অথবা দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেবেন তা একান্তই তার সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে তিনি (আহাদ) কোনও তদবির করেননি আর প্রধানমন্ত্রী কোনও তদবির পছন্দও করেন না। তাকে আবারও মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়েছে কিনা তা তার জানা নেই।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ’নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’
সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় আহাদ আলী সরকার বাদী হয়ে মামলা করার পর প্রধান আসামি সাব্বিরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে কোর্টে চালানও দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যহত রয়েছে।
পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জী জানান, এ ঘটনার পর আহাদ আলী সরকার ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছে।