হদিস নেই ২৮ আসামির

2_8530

চালঞ্চল্যকর চার হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত ২৮ আসামি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা কোথায়- জানে না আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা, রমনার বটমূল, ১০ ট্রাক অস্ত্র ও বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের সর্বশেষ অবস্থান জানাতে পুলিশকে ৭ কর্মদিবস সময় বেঁধে দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদের ‘অবস্থান এখনও শনাক্ত করা যায়নি’ উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। অথচ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি- আসামিদেও কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছে। কিন্তু আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের দেখছেন না। ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার যুগান্তরকে বলেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর প্রশ্নই আসে না। তারা আত্মগোপনে রয়েছে। কোনো আসামি পুলিশের দৃষ্টিগোচর হলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে।

সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা মনিটরিং সেলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। একপর্যায়ে আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা, বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা, রমনা বটমূল এবং দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার পলাতক আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় বলা হয় চারটি মামলার মোট ২৮ আসামির খবর কেউ জানেন না। আলোচনার এক পর্যায়ে ২৮ পলাতক আসামির সর্বশেষ অবস্থা পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য পুলিশ সদর দফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়।

জানা গেছে, এ নির্দেশের পর প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার ৯ জন, রমনার বটমূল মামলার ৪ জন, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার ২ জন এবং বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার ১৩ জন আসামির খোঁজ শুরু হয়। কিন্তু পুলিশ এদের সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের (সাত কর্মদিবস) অনেক পরে ২৫ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট জমা দেয় পুলিশ সদর দফতর। এতে আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার পলাতক খুনিদের বিষয়ে বলা হয়, এদের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ কিছুই জানে না। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার দুই আসামির বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়, মামলার নথি হাইকোর্টে। বিধায় হাল নাগাদ তথ্য দেয়া সম্ভব হল না। নথি পাওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী অবহিত করা হবে। রমনা বটমূল মামলার আসামি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি। বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আসামিদের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। এই রিপোর্ট মনিটরিং সেলের আগামী সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে কবে নাগাদ এ সভা অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা : ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অবরোধের মধ্যে পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি মিছিল থেকে জামায়াত-শিবির সন্দেহে দর্জি বিশ্বজিৎ দাসকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওইদিনই সূত্রাপুর থানায় মামলা হয়। মামলার রায় হয় ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর। এতে ৮ জনকে ফাঁসি ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ২১ আসামির সবাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী। বর্তমানে ৮ জন কারাগারে আটক রয়েছে। বাকি ১৩ জনের মধ্যে ফাঁসির আসামি রাজন তালুকদার ও মীর নূরে আলম লিমন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া খন্দকার ইউনুস আলী, তারিক বিন জোহর তমাল, আলাউদ্দিন, ওবায়দুল কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, আল-আমিন, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন এখনও পলাতক। সূত্রমতে, খন্দকার ইউনুস আলী, তারেক বিন জোহর তমাল, ওবায়দুল কাদের, আজিজুর রহমান, মীর নূরে আলম লিমন, আল আমিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, কামরুল হাসান ও মোশারফ হোসেন পুরান ঢাকায় অনেকটা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। রাজন তালুকদার এখন কলকাতায় অবস্থান করছেন। তবে রাজন মাঝে মধ্যেই ঢাকায় আসছেন। ইমরান, পাভেল ও আলাউদ্দিনসহ কয়েকজন রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায় বসবাস করছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, গত তিন মাসে ফাঁসির আসামি রাজন তালুকদারকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দু’বার দেখা গেছে। এর মধ্যে মাসখানেক আগে সন্ধ্যায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে তাকে দেখা গেছে। আনুমানিক তিন মাস আগে রাত ৮টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে তাকে চা খেতে দেখা যায়। লিমনকেও একই এলাকায় দেড় মাস আগে কয়েকবার দেখা গেছে বলে তারা জানিয়েছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফুটপাতে এক সময় ব্যবসা করতেন এমন একজন ব্যবসায়ী যুগান্তরকে জানান, তিনি দেড় মাস আগে পাভেলকে রাজধানী সুপার মার্কেটের সামনে মোটরসাইকেলে দাঁড়িয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছেন।

বিশ্বজিতের পিতা অনন্ত চন্দ্র দাস যুগান্তরের কাছে দাবি করেছেন, তার ছেলের খুনিরা এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক সাংবাদিক তাকে ফোন করে এসব তথ্য জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘হ্যারা (আসামিরা) করে সরকারি দল। এ কারণে তারা বাইরে ঘুরতে পারতাছে। অনেকে আমারে ফোন করে জানাইছে তারা (আসামিরা) ঘুরে, মিটিংয়ে যায়। এমনিতে আমরা সংখ্যালঘু, এহন সরকারের বিরুদ্ধে কিছু কইতে পারুম না, করতেও পারমু না, এহন আল্লার ওপর ভরসা। এছাড়া আমগো করার কিছু নাই।’

আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা : সন্ত্রাসীরা ২০০৪ সালের ৭ মে টঙ্গীর নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশফায়ারে প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করে। ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল দ্রুত বিচার আইনে এ হত্যা মামলার রায় হয়। রায়ে প্রধান আসামি নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে ফাঁসি ও ৬ জনকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া হয়। প্রধান আসামিসহ ১৭ জন বন্দি রয়েছে। ইতিমধ্যে আসামি রতন মিয়া ও আল আমিন মৃত্যুবরণ করেছে। বাকি ৯ জনের মধ্যে নুরুল ইসলাম দিপু, অহেদুল ইসলাম টিপু, আনোয়ার হোসেন আনু, খোকন, ফয়সাল, সৈয়দ আহম্মেদ মজনু, জাহাঙ্গীর, বুলু, মিরপুরের মশিউর রহমান ভারত, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে। তবে পুলিশ সদর দফতরের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘পলাতকদের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়নি।’

আহসানউল্লাহ মাস্টারের জ্যেষ্ঠপুত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি গাজীপুর-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘শুনেছি দিপু ও টিপু বেলজিয়ামে আবার কেউ কেউ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে রয়েছে। বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এখনও আমার দাদি ও মা বেঁচে আছেন। বাবাকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না, কিন্তু আমরা খুনিদের শাস্তি দেখতে চাই। কূটনৈতিক চ্যানেলে খুনিদেও দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করাই আমাদের দাবি।’

রমনা বটমূল মামলা : প্রায় ১৫ বছর আগে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখে (২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল) বোমা হামলার ঘটনায় ওই দিনই মামলা হয়। বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে সিআইডি পুলিশ। মামলার মোট ১৪ আসামির মধ্যে মুফতি হান্নানসহ ১০ জন বর্তমানে আটক রয়েছে। মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই এখনও পলাতক রয়েছেন।

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা : ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) সংরক্ষিত জেটি ঘাটে মাছ ধরার ট্রলার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র নামিয়ে ট্রাকে তোলার সময় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এমভি শাহ আলম ও এমভি খাজার দান নামে দুটি ফিশিং ট্রলার থেকে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়।

অস্ত্র আটকের ১ দিন পর ৩ এপ্রিল কর্ণফুলী থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ১ এবং ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে অপর ১ মামলা করা হয়। এতে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত শিল্প সচিব নুরুল আমিনসহ দুটি মামলায় ৫২ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডসহ নানা মেয়াদে সাজা দেয় আদালত। বর্তমানে মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জন আটক রয়েছেন। তবে উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত শিল্প সচিব নুরুল আমিন মামলার রায় ঘোষণার সময় পলাতক ছিলেন। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিআইডি পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে মামলার মূল নথি হাইকোর্টে থাকায় পলাতক আসামিদের হালনাগাদ তথ্য পাঠানো সম্ভব হল না। নথি পাওয়া সাপেক্ষে তথ্য অবহিত করা হবে।’